পাখিদের আহমদউল্যাহ

 

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুক কানুপুর ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামে ঢুকেই হকচকিয়ে যেতে হলো। রাস্তার ধারে, পুকুরের পাড়ে, জমির ধারে, স্কুলের চারপাশে, ঘরের খুলিতে (দুই ঘরের মাঝখানে) যেখানেই বড়সড় আর মাঝারি ধরনের গাছ, সেখানেই ডালে ডালে কলস বাঁধা। বাজারে যাচ্ছিলেন স্থানীয় তালুক কানুপুর দ্বিমুখী স্কুলের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁকে থামিয়ে ঘটনাটি জিজ্ঞেস করলে হেসে বললেন, 'এসব আমাদের আহমদ পাগলার কাণ্ড। কলসি দিয়ে পাখিদের বাসা বানিয়ে দিয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছেলেটা বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসবেই মেতে থাকে।' পথচারী ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান

বললেন, 'প্রথম দিকে অক সগলে পাগলা কতো। এখন মাইনসে পায়তো অক মাতাত তুলি রাকে। চ্যাংড়াটার মন খুবে বড় !' এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে লক্ষ করা গেল, সবার মধ্যেই তাঁকে 'পাগল' বলার ভেতরেও এক ধরনের অহঙ্কার কাজ করছে।
একে ওকে জিজ্ঞেস করতেই তাঁরা আহমদউল্যাহর বাড়ির ঠিকানা দিলেন। বাবা আলাউদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। মা খুরশিদা বেগম গৃহিণী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে আহমদউল্যাহ পঞ্চম। তিনি কামিল চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র। নাম শুনে বিশাল মানুষ মনে হলেও হালকা-পাতলা গড়নের আহমদউল্যাহকে দেখে বিশ্বাস করা শক্ত যে এতো বড় একটি কর্মযজ্ঞে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাড়ির সামনে বসে কথা হলো আহমদউল্যাহর সঙ্গে। এতো কাজ থাকতে পাখির জন্য বাসা বানানোর ইচ্ছে হলো কেন? প্রশ্ন করতেই তিনি জানান, ২০০১ সালে একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে কেটে ফেলা একটি আমগাছের পাশে কয়েকটি নিরাশ্রয় শালিকের বাচ্চা রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর মন কেমন করে ওঠে। মনে হয় 'আহারে ওরা ওদের মাকে হারিয়ে ফেলেছে, এই বাচ্চাগুলো এখন কোথায় যাবে'! পাখিগুলোকে অন্য একটি গাছের ডালে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে পড়ার টেবিলে বসে অনেক ভেবে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। সেই ভাবনা থেকে পরদিন গ্রামে মোট গাছের হিসাব নিতে বের হন আহমদ। প্রথমে নিজের বাড়ির গাছে তিনটি কলস বাঁধেন। পনের দিন যেতেই এসব কলসে আশ্রয় নেয় ছয় জোড়া পাখি।আহমদ অবাক হয়ে দেখতে থাকেন পাখিদের ঘর-সংসার, বংশবৃদ্ধি। নিজের সাফল্যে মুগ্ধ হন তিনি।
আহমদ কাজ শুরু করেন ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে ও ছুটির দিনে তিনি এসব কাজ করেন। পড়াশোনা আর হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে মাটির তৈরি কলস কেনেন তিনি। প্রতিটি কলসের দাম সাত টাকা। তাই রয়েসয়ে প্রথম বছরেই বিভিন্ন জাতের গাছে ১৪০টি শূন্য কলস লাগান আহমদ। প্রতিটি কলস একটু বাঁকা করে বাঁধা হয়। বৃষ্টির পানি বেরুবার জন্য কলসের নিচে ফুটো করে দেওয়া হয়। খড়কুটো সংগ্রহ করে পাখিরা নিজেই কলসের ভেতর বাসা তৈরি করে। আহমদের কলসের বাসায় দোয়েল, কোয়েল, শালিক, হুতুমপেঁচা, টিয়াসহ প্রায় সব ধরনের দেশি পাখি বাসা বেঁধেছে। তাঁর কাজ দেখে ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত গ্রামের চাকরিজীবীরা ঈদের ছুটিতে এসে তাঁকে সহায়তা করে। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খলিলুর রহমান আহমদের কাজের প্রশংসা করে বলেন, 'পাখিরা এমনিতেই মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। আহমদ তাদের জন্য নিরাপত্তাবোধের অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। শুরুতে আহমদ ছিল একা; কিন্তু কাজ বেড়ে গেলে এক সময় তাঁর একার পক্ষে পাখির বাসা দেখাশোনা ও বাসাগুলো সংরক্ষণ দুরূহ হয়ে পড়ে। তখন তিনি ২০০৭ সালে উত্তরপাড়া শান্তিসংঘ নামে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ক্লাবের সভাপতি আহমদউল্যাহ নিজেই। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অনার্স পড়ুয়া ছাত্র হাবিবুল্লাহ। তিনি জানালেন, রাস্তার পাশে ও বাড়ির আনাচে-কানাচের গাছে বাঁধা কলস যাতে ছোট ছেলে-মেয়েরা ঢিল ছুড়ে নষ্ট না করে সংগঠনের সদস্যরা তা দেখাশুনা করেন। এ ছাড়া যেসব গাছের কলস ঝড়ে ভেঙে যায় সেগুলোতে নতুন কলস বেঁধে দেওয়াও তাঁদের কাজ। আহমদের কাজ দেখতে এতদিন বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী, পাখিপ্রেমী ছুটে এসেছেন ছোট্ট উত্তরপাড়া গ্রামে। পিঠচাপড়ে দিয়েছেন অনেকেই। ১৩ মে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত পরিবেশ ও পাখি সংরক্ষণ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেল আহমদ ও তাঁর উত্তরপাড়ার শান্তি সংঘ।

 

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ (অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা)

 
 
 

 

copyright 2005 - 2011. All rights reserved. e-Palki.com