অপার সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প

রফতানির নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা এবং পুঁজি বিনিয়োগকারিরা এ খাতে মনোযোগী হলে আগামীতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক খাতে নতুন এক বিপ্লবের সূচনা ঘটবে। প্রতি বছর আয় হবে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এ খাত থেকে কর্মসংস্থান হবে লক্ষাধিক দক্ষ শ্রমিক।

শুধু তাই নয়, জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণ একটি দেশে পরিণত করার দুর্লভ সুযোগ করা গেলে এ খাতটি এ দেশের বিদ্যমান সব ক'টি খাতকে ছাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রথম স্থানে চলে যাবে। সরকারি-বেসরকারি এবং জাহাজ নির্মাণ খাতে পুঁজি বিনিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এ খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের গর্বিত অতীত আছে। বলা যায়, জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশ আবার সেই

গৌরবোজ্জ্বল অতীত ফিরিয়ে আনার পথে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের নির্মিত জাহাজ ইউরোপে রফতানি হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ বেশ উন্নত বলে ইউরোপে প্রশংসিত হয়েছে।

নানা কারণেই জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বাংলাদেশ অন্যতম স্থান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলক কম খরচ। জাহাজ নির্মাণে প্রচুর দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণে স্বল্প খরচে প্রচুর শ্রমিক পাওয়া যায়। আর এ কারণে নির্মাণ খরচ অনেক কম। দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্রবেষ্ঠিত হওয়ায় ভৌগলিক সুবিধা এ সম্ভাবনার ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

সমপ্রতি জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা আইএমও'র জারিকৃত আইএসপিএস কোডের কারণে ২৫ বছরের বেশি পুরনো জাহাজগুলো আগামী বছর থেকে চলাচল করতে পারবে না। আইএমও'র এ নির্দেশনার কারণে কেবল ইউরোপীয় দেশগগুলোকেই কিছুদিনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার নতুন জাহাজ বাদ দিতে হবে এবং এর স্থলে নতুন জাহাজ যোগ করতে হবে। আর এ জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশই হতে পারে অন্যতম বিকল্প হিসেবে। কারণ বিশ্বের অন্যতম জাহাজ নির্মাণকারী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের সব ক'টি শিপইয়ার্ড আগামী ৫ বছরের জন্য বুকড হয়ে আছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট কতর্ৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে সম্ভাবনার পালে লাগবে নতুন হাওয়া।

জানা গেছে, বাংলাদেশে চলতি বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের জাহাজ নির্মাণ কাজ চলছে। ৩টি ইয়ার্ড রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণ করছে। ইয়ার্ডগুলো হলো_ আনন্দ শিপইয়ার্ড, ওয়েস্টার্ন মেরিন এবং হাইস্পিড। তবে এ ধরনের আরো ইয়ার্ড থাকলে এ খাত থেকেই বাংলাদেশের রফতানি বছরে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হতো। ইতোমধ্যে জাহাজ রফতানি করে বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি গোষ্ঠী এ খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের অনুমোদন দিতে বাধা দিচ্ছে। যার ফলে চাহিদা ও সুযোগ থাকার পরও নতুন উদ্যোক্তারা আসতে পারছে না।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে রয়েছে নানা সমস্যাও। অবকাঠামোগত সমস্যা, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার, কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় রেটিং না থাকা। উদ্যোক্তারা জানান, এ খাত বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা এবং শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পে প্রচলিত শর্তে বন্ডেড সুবিধা। এ শিল্প বিকাশে যেসব সমস্যা রয়েছে তার অন্যতম হলো ব্যাংক সার্ভিস চার্জ অনেক বেশি। জাহাজ নির্মাণের জন্য বিদেশ থেকে যে কাঁচামাল নিয়ে আসা হয় সেগুলোর জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক রেটিং অনেক কম হওয়ায় বিদেশ থেকে তা প্রত্যাখ্যান হয়। তখন বিদেশি কোনো ব্যাংক থেকে এ গ্যারান্টি নিতে হয়। এ গ্যারান্টি বাবদ কমিশন অনেক বেশি। জাহাজ নির্মাণ যেহেতু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এ জন্য দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাংক ঋণ নিতে হয়। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে যেখানে সুদ দিতে হয় ৭ থেকে ৮ শতাংশ সেখানে এ শিল্পের জন্য সুদ দিতে হয় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। কাঁচামাল আমদানি করার সময় ডিউটি খরচও অনেক বেশি, ১০ মিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করতে ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। এছাড়া ছাড়পত্রের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সমস্যা। ইয়ার্ডসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো সুবিধা, শিল্প প্রসারে সহায়তা, প্রণোদনা সুবিধা নিশ্চিত করা না হলে সম্ভাবনাময় এ খাতটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

অবশ্য জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সমস্যাগুলো দূর করে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন এক্সপোর্ট প্রোমোশন বু্যরো (ইপিবি) একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করেছে।

রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নে ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সম্মতি দেয়ার পরও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সোনালি অতীত : আমাদের দেশে জাহাজ শিল্প প্রতিষ্ঠার সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। যখন পালে চলা কাঠের জাহাজ সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিত সে যুগে বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ছিল রমরমা অবস্থা। নৌ বাণিজ্যে পারঙ্গম আরবদের সহযোগিতায় চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছিল জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিশাল অবকাঠামো। চট্টগ্রামে নির্মিত সমুদ্রগামী জাহাজ বাণিজ্যতরী হিসেবে রফতানি করা হতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। শুধু তাই নয়, রণতরী হিসেবেও চট্টগ্রামের জাহাজের ছিল বিশেষ কদর। স্পেনীয় রণতরীগুলো যখন ভূমধ্যসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরে দাঁপিয়ে বেড়াত তখন সেই বহরে বাংলায় নির্মিত নৌযানের সংখ্যা একেবারে কম ছিল না। আর্মাড নামে পরিচিত স্পেনীয় ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী নৌযুদ্ধে চট্টগ্রামে নির্মিত বহু রণতরী যে স্পেনীয় বহরে অন্তভর্ুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এ সত্য ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। বাষ্পচালিত নৌযান আবিষ্কারের পর থেকে বাংলাদেশ জাহাজ শিল্পে ঝিমিয়ে পড়ে। প্রশিক্ষিত শিপ বিল্ডিং প্রকৌশলীর অভাবে জাহাজ শিল্প ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরে প্রায় ১০০ বছর পর ২০০৮ সালে আনন্দ শিপইয়ার্ড ডেনমার্কে স্টেলা ম্যারিস রফতানির মাধ্যমে এ শিল্পের পুনরুত্থান এবং নবযাত্রা শুরু করে। আবার বাংলাদেশি জাহাজ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে।

এখন যা প্রয়োজন : ইতোমধ্যেই বিশ্বে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ কারিগরদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। এ সুনাম আরো বৃদ্ধি করতে হলে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করতে হবে। এ শিল্পের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট করতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষণা করলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। ভারতে এ শিল্পে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকের গ্যারান্টি চার্জ হিসেবে আরো ৪ থেকে ৫ শতাংশ বর্তায়। উদ্যোক্তারা বলছেন, আমরা এইড চাই না, চাই ট্রেড ফেসিলিটি। এ শিল্পের জন্য ট্রেড ফেসিলিটি নিশ্চিত ও কার্যকর করা হোক।

সম্ভাবনা : জাহাজ নির্মাণ একটি শ্রমঘন শিল্প খাত। উদ্যোক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার অত্যন্ত সস্তা হওয়ায় এক্ষেত্রে আমরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারি। স্বল্পতম মজুরির দ্বিগুণ দক্ষ জনবল সুদক্ষ প্রকৌশলী রয়েছে। জাহাজ নির্মাণে বিশেষজ্ঞেরও কমতি নেই। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কথা ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে গিয়ে পেঁৗছেছে। দেশি প্রযুক্তি ও লোকবল ব্যবহার করে দেশের শিপইয়ার্ডগুলোতে যাত্রীবাহী জাহাজ, অয়েল ট্যাংকার, টাগবোট, ফিশিং বোটসহ নানা ধরনের যান্ত্রিক নৌযান নির্মাণে বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়েছে।

বিশ্বে প্রতি বছর সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ৬ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু জাহাজ নির্মাণ শিল্প বাড়ছে ৩ শতাংশ হারে। জাহাজের সংখ্যা ও নির্মাণের মধ্যে এ বিশাল ব্যবধানটির আর্থিক মূল্য ৩৩ হাজার ২৮ কোটি ডলার বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আর জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যে ৩ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে তার ১ শতাংশও যদি বাংলাদেশ পূরণ করতে পারে তাহলে প্রায় ১২ হাজার কোটি ডলারের বাজার বাংলাদেশ দখলে নিতে পারবে। এ পরিমাণ আয় বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হবে কমপক্ষে ২০টি আন্তর্জাতিকমানের শিপইয়ার্ড।

শতভাগ রফতানিমুখী পণ্যখাতের মধ্যে একমাত্র শিপ বিল্ডিং খাতে শুরুতে ভ্যালু এডিশনের পরিমাণের হার ৩৫ শতাংশ, যা অন্য কোনো শিল্পে হয় না। গার্মেন্টসে শুরু হয় আড়াই শতাংশ ভ্যালু এডিশন দিয়ে। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাহাজ নির্মাণ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। আগামী দু'বছরের মধ্যে এ খাতে আসবে আরো সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া এ সেক্টরে এখন যে অবকাঠামো আছে, তাতেই বছরে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। সরকার যদি তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের মতো আমাদেরও সমান হারে সুবিধা দেয়, তাহলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে এ শিপ বিল্ডিং সেক্টর থেকে বছরে ৭০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানানো হয়, নদীমুখসহ সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত এমন এলাকাগুলোকে ঘিরে অবিলম্বে শিপ বিল্ডিং জোন প্রতিষ্ঠা করার সরকারি ঘোষণা বাস্তবায়ন জরুরি। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জনকারী ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের এমডি সাখাওয়াত হোসেনের মতে, 'শিপ বিল্ডিংয়ে লাইট অব হোপ টু দি নেশন'।

ছোট ও মাঝারি জাহাজ নির্মাণে সম্ভাবনা বেশি : জাহাজ নির্মাণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো আগামী ২০ বছরের জন্য নতুন অর্ডার নিতে পারছে না। এসব দেশগুলো ৩০ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার নিচে কোনো জাহাজ তৈরিতে আগ্রহী নয়। এছাড়া ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো এখন অত্যাধুনিক সাবমেরিন নির্মাণে ব্যস্ত। বিশ্বে ছোট ও মাঝারি আকারের সমুদ্রগামী জাহাজের চাহিদা থাকায় প্রধান প্রস্তুতকারক দেশগুলোর বাইরে বিকল্প খোঁজে বিশ্বব্যাপী তৎপর ক্রেতারা। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশের প্রতি ঝুঁকেছে। এ সুযোগটা কাজে লাগানোর এখনই সময়। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জাহাজ নির্মাণে আরো বেশি দক্ষতা প্রদর্শনই এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শিপইয়ার্ড : বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ ক'টি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের পটিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, ঢাকার মেঘনাঘাট এলাকায় আনন্দ শিপ বিল্ডার্স শীর্ষস্থানে রয়েছে। এছাড়া খান বিল্ডার্স, হাইস্পিড গ্রুপ, কর্ণফুলী শিপইয়ার্ড, খুলনা শিপইয়ার্ড, বসুন্ধরা গ্রুপসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। মেড ইন বাংলাদেশ এ নামে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ চলাচল শুরু করেছে। এ দেশের নির্মাণ কাজ বিশ্বমানে উন্নীত হওয়ার পর জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, পাকিস্তান, মোজাম্বিক, লিবিয়া ও মালদ্বীপ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিভিন্ন শ্রেণীর জাহাজ নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ ও কার্যাদেশ দিয়েছে। এর পাশাপাশি সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এ খাতে বাংলাদেশে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

প্রথম সমুদ্রগামী জাহাজ রফতানি : রফতানি তালিকায় সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য হিসেবে ২০০৮ সালের ১৫ মে সমুদ্রগামী জাহাজ রফতানি শুরু হয়। ডেনমার্কের স্টেলা শিপিং কোম্পানি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড শিপ ওয়েজ কোম্পানির জাহাজটি ক্রয় করে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রায় শত বছর পর আন্তর্জাতিক বাজারে গেল এ অঞ্চলের জাহাজ। এরপর অনেক জাহাজ এ দেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়েছে। সর্বশেষ 'গ্রোনা অ্যামারসাম' ও 'গ্রোনা বিয়েসসাম' নামে দুটি জাহাজ জার্মানির গ্রোনা শিপিং কোম্পানির কাছে বিক্রি করেছে বাংলাদেশের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টল্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। গত ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম ড্রাই ডক জেটি থেকে জাহাজ দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।

পশ্চাৎসংযোগ শিল্পের বিকাশ : দেশে জাহাজ শিল্পের বিকাশ ঘটলে এ খাতের সংশ্লিষ্ট অনেক শিল্পের বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। জাহাজ রফতানি করে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সে সঙ্গে দেশে নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের দ্বার উন্মোচন হবে। জাহাজ নির্মাণের কাঁচামালসহ আনুষঙ্গিক যেসব জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ এ শিল্পে ব্যবহৃত অনেক কিছুই দেশে প্রস্তুত করা সম্ভব। জাহাজের সাজসজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, দরজা জানালা, পোর্ট হোল, ফেয়ার লিডস, ম্যাট ল্যাডার্স, সিঁড়ি, গ্যাংওয়ে, গ্রিল, ট্রলি, নিরাপত্তা সামগ্রী মধ্যে রয়েছে লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়, লাইফ বোট, রেসকিউ, নেট এসব সামগ্রী দেশেই প্রস্তুত করা সম্ভব। এগুলো ছাড়াও মেরিন লাইটিং, মেরিটাইম সাইন, সিম্বল এবং পোস্টার, নোঙর ও লোহার শিকল, বিভিন্ন ধরনের মেরিন কেবল, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, সুইচগিয়ার, পিস্টন রিং, পাইপ, পাম্প, শিপ বিল্ডিং প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী দেশীয় কারখানায় তৈরি করে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। এছাড়া এ শিল্পের সাথে জড়িত উদ্যোক্তারা জানিয়েছে জাহাজ নির্মাণের কাঁচামালের ৯০ শতাংশই ভেঙে ফেলা জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাকি ১০ শতাংশ আমদানিনির্ভর।

আরএইচ কৌশিক, সৌজন্যেঃ ইত্তেফাক

 
 
 

 

copyright 2005 - 2011. All rights reserved. e-Palki.com